সেনাবাহিনীর চত্রছায়ায়: পাহাড় কেটে মসজিদ-মাদ্রাসা তৈরী, চলছে ধর্মান্তর।

ছবি: পাহাড় কেটে মসজিদ-মাদ্রাসা তৈরী, চলছে ধর্মান্তর।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর চত্রছায়ায় পীরের কেরামতিতে পাহাড় কেটে চলছে মসজিদ-মাদ্রাসা তৈরী এবং করা হচ্ছে আদিবাসীদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর। সেনাবাহিনীর সমর্থনে পরিবেশ ও বন আইনের তোয়াক্কা না করেই খননযন্ত্র দিয়ে গিলে ফেলা হয়েছে বিশাল পাহাড়। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অনুমতি ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না, সেখানে সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া কোন ভাবেই এমন কর্মযজ্ঞ সম্ভব না। অর্থ্যাৎ সেনাবাহিনীর অনুমতি নিয়েই চলছে এই কর্মযজ্ঞ।

এই ঘটনা চট্টগ্রাম জেলা ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ধুল্যাছড়ি এলাকায়।

পাহাড় কেটে তোলা মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে পাশের উর্বর কৃষিজমি। এতে একদিকে ধ্বংস হয়েছে বন, অন্যদিকে মরছে চাষের জমি। বদলে যাচ্ছে পুরো এলাকার ভূ-প্রকৃতি। কাটা পাহাড়ের ঢালে গাছ ও বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে কয়েক কক্ষের একটি স্থাপনা। নাম দেওয়া হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

সেনাবাহিনী এবং বাঙালি সেটলার মুসলিমদের সহযোগিতায় রাউজান থেকে এসে হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী দীর্ঘদিন ধরে পাইন্দং এলাকার একটি দরবারে অবস্থান করেন। এরপর ধাপে ধাপে শুরু হয় বন বিভাগের জমি দখলের মহাযজ্ঞ। ৪ জানুয়ারি বিকেলে কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ধুল্যাছড়ি এলাকায় গিয়ে চোখে পড়ে এই ভয়াবহ দৃশ্য।

স্থানীয়রা জানান, দিনের আলোতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড় কাটার কাজ চললেও কোনো সরকারি দপ্তরের কেউ সেখানে আসেননি।

কর্তনকৃত পাহাড়টির দেখভালের দায়িত্বে থাকা মাস্টার হারুন নির্দ্বিধায় বলেন, ‘জায়গাটি মূলত রিজার্ভ ফরেস্টের। গত বছর আমরা দখলে নিয়েছি। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে। পাহাড় কাটতে প্রায় ১০ লাখ টাকা এক্সভেটর ভাড়া লেগেছে। বিষয়টি সবাই জানে- কেউ বাধা দেয়নি। হুজুরের দরবারে বড় বড় সাংবাদিক, নেতা আর প্রশাসনের লোকজন আসেন। আমাদের কিছু হবে না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী একজন ধর্মীয় পীর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাহমাতুল্লিল আলামীন কমপ্লেক্স ও আঞ্জুমানে নঈমীয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় ‘জালালীয়া রজবীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়’ স্থাপনের নামে এই পাহাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এর প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জালালীয়া রজবীয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা রয়েছে যার নির্মাণকালেও পাহাড় কাটা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়।

পাইন্দং ইউনিয়নের আমতল রাবারবাগান এলাকায় আশরাফাবাদ দরবার শরীফের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দখলকৃত জায়গায় মাদ্রাসা সবখানেই একই ছক, একই কায়দায় পাহাড় কাটা। বারবার একই অপরাধ, অথচ নেই কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

এইসব প্রতিষ্ঠান থেকে করা হচ্ছে আদিবাসীদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর, চালানো হচ্ছে লাভ জিহাদ, ল্যান্ড জিহাদ। তাদের লক্ষ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আদিবাসী শূণ্য করা।

প্রশ্ন উঠছে এটি কি পীরের অলৌকিক কেরামতি, নাকি পর্দার আড়ালের অদৃশ্য ম্যানেজমেন্ট?

স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, পীরগিরির আড়ালে পাহাড় কর্তন ও বনভূমি দখলের বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা চলছে। এতে পরিবেশ ও কৃষি দুটোই পড়ছে চরম ঝুঁকিতে। বিষয়টি জেনে কাঞ্চননগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নজরুল ইসলাম উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

জালালাবাদ দরবার শরীফের পীর হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী পাহাড় কেটে বিদ্যালয় স্থাপনের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি শাহ জালাল বাবার নামে সড়ক করেছি, মাদ্রাসা করেছি। এখন বিধর্মীদের জন্য একটি স্কুল করছি।’

নারায়ানহাট রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক খান আবরারুর রহমান বলেন, বিষয়টি জানা ছিল না।

পরিবেশবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ বলেন, ‘টিলা-পাহাড় কর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মারাত্মক হুমকি। পাহাড় প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে পাহাড় ধ্বংস করা ভয়ঙ্কর নজির। দ্রুত আইনি ব্যবস্থা জরুরি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *