
মানুষের যাপিত জীবনের বড় শত্রুকে কখনই সহজে চেনা যায় না। একসাথে চলতে চলতে অবশেষে স্বরূপ প্রকাশিত হয়।বন্ধু বা প্রিয় আপনজন শত্রু হলে এর থেকে ভয়ংকর আর কিছুই হতে পারে না। জগতের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বা কুখ্যাত ব্যক্তি বিপদে পরেছে শুধু আপনজনদের দ্বারা। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনও সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের ধরা পরে কাছের নিকটাত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতায়। মাস্টারদা সূর্য সেন ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারি পটিয়া উপজেলার গৈরালা গ্রামে আত্মগোপন করেন। সে সময়ে বিদেশি ব্রিটিশ সরকার তাঁর মাথার দাম প্রথমে পাঁচহাজার টাকা ধার্য করে। পরবর্তীতে সেই টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দশহাজার টাকায় পরিণত করে দেয়। যাতে টাকার লোভে পরে কেউ মাস্টারদাকে ব্রিটিশ শাসকদের কাছে ধরিয়ে দেয়। মাস্টারদা সূর্য সেন পটিয়ায় তাঁর এক আত্মীয় ব্রজেন সেনের ব্যবস্থাপনায় তাদের গ্রামের বিশ্বাস-বাড়ির গৃহবধু ক্ষিরোদাপ্রভা বিশ্বাসের ঘরে আশ্রয় নেন। ব্রজেন সেনের বাসা থেকে কার জন্য খাবার নিয়ে ক্ষিরোদাপ্রভা বিশ্বাসের ঘরে যাচ্ছে, তা জানার জন্য ব্রজেন সেনের ভাই নেত্র সেন বিশেষ আগ্রহী হয়ে, পরবর্তীতে সূর্য সেনের অবস্থানের কথা জানতে পরে।সেই নেত্র সেনই টাকার লোভে দেশ ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশ পুলিশকে মাস্টারদার অবস্থানের তথ্য পাচার করে দেয়। রাতেরবেলা আলোর সংকেত দেখিয়ে নেত্র সেন সৈন্যদের পথ দেখায়। বিষয়টি ব্রজেন সেন বুঝতে পেরে শেষ মুহূর্তে চেষ্টা করেও সূর্য সেনকে রক্ষা করতে পারেননি। মাস্টারদা গোর্খা ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে ধরা পড়ে যায়।পরবর্তীতে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারিতে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।
চট্টগ্রাম বীর প্রসবিনী ভূমি। যুগে যুগে অসংখ্য জ্ঞাত বা অজ্ঞাত বীরের জন্ম হয়েছে এই ভূমিতে। তাই চট্টগ্রামকে গর্ব করে বলা হয় ‘বীর চট্টলা’। চট্টগ্রাম যেমন মাস্টারদা সূর্য সেনের পবিত্র ভূমি, তেমনি পক্ষান্তরে নেত্র সেনেরও ভূমি। এ আত্মঘাতী বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনেরা যুগে যুগেই ছিল আছে এবং থাকবে ।তাদের কারণেই ইতিহাসে অনেক বড় বড় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আজও নেত্র সেনের প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায় কোনো আন্দোলন, সংগ্রামকে ধ্বংস করার জন্য। তারা লিখতে না জানলেও ভালো করে মুছতে জানে। তারা ব্যক্তিস্বার্থে সকল কিছুই করতে পারে। তাদের বিবেক কখনো তাদের সম্মুখে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আয়নাতে নিজের স্বার্থপর চেহারাটি দেখলেও তারা কখনো লজ্জিত হয় না।
লিখেছেন –
ড. শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।