
২০২৬ সালের কলকাতা বই মেলায় আসতেছে দেবশ্রী চক্রবর্তীর নতুন ‘৫৪-এর গন্ডির বাইরে’।
লেখিকা দেবশ্রী চক্রবর্তী তার এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ‘৫৪-এর গন্ডির বাইরে’ নতুন বই সম্পর্কে বলেন,
ইতিহাসের এমন কিছু অধ্যায় থাকে, যাকে রাষ্ট্র শাসকের উদ্দেশ্যে অন্ধকারে আবৃত করে রাখা হয়। ভারতের ইতিহাসের সেরকম একটি অধ্যায়কে পাঠকের সামনে তুলে ধরার জন্য এবার কলম ধরেছি।
মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৭১ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের জন্য সর্বোকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরা হয়। সত্যিই কী তিনি ভারতের সর্বকালের সেরা প্রধানমত্রী ছিলেন?
১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের থারপারকার সহ নাগার পারকারের প্রায় ৩০০০ স্কয়ার মাইল অঞ্চল দখল করে নিয়েছিলেন। কিন্তু মিসেস গান্ধী শিমলা চ্যূক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানকে সেই অঞ্চল ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু কী তাই?
১৯৭১ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে যে ৯৩০০০ পাকিস্তানী সেনা ভারতীয় সেনার হাতে বন্দী হন, ইন্দিরা গান্ধী তাদের ভারতের এলাহাবাদ, জব্বলপুর, দিল্লি সহ বিভিন্ন শহরে তাদের প্রায় জামাই আদরে রেখে দিয়েছিলেন। উচ্চপদস্থ সেনা অফিসারদের জন্য আলাদা রাধুনির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। সেনা অফিসারদের নাকি সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়া হতো, দিল্লিতে কয়েকজন পাকিস্তানী সেনাকে প্রধানমত্রীর বাসভবনের কাছে রাখা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে মিসেস গান্ধী শিমলা চ্যুক্তির মাধ্যমে এইসব সেনাদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
৭১ এর যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং শেখ মুজিবর রহমানের মতো একজন ব্যক্তি যিনি ১৯৪৬ এর আগস্ট মাসে কলকাতায় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে হিন্দু নিধনে অন্যতম কাণ্ডারি রূপে কাজ করেছিলেন, তাঁকে পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসা। এর জন্য অসংখ্য ভারতীয় সেনাকে তিনি বলিদান দিয়েছিলেন, যাদের সারাটা জীবন পাকিস্তানের জেলের অন্ধকার কুঠুরিয়ে নারকীয় জীবন কাটাতে হয়েছিল। হিসেবটা বলা হয় ৫৪ জন, কিন্তু সংখ্যাটা তার থেকে অনেক বেশি ছিল।

৭১ এর যুদ্ধে জয়ের জন্য ইন্দিরাগান্ধী ভারতরত্ন পেলেন, কিন্তু আমাদের বীর যোদ্ধারা, যারা জয় নিয়ে আসলেন, তাঁরা চিরতরে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন। কিন্তু এই অন্ধকার থেকেই তাঁরা নিজেদের বেঁচে থাকার প্রমান দিয়ে গিয়েছেন। বিভিন্ন সময় তাঁরা নিজেদের পরিবারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন, আবার আমাদের গপ্তচর কিংবা সেনারা যারা পাকিস্তানের জেল থেকে ফিরে এসেছিলেন, তাঁরা এইসব সেনাদের কথা জানিয়েছেন। তাদের বর্ননা অনুসারে অত্যাচার সহ্য করতে করতে অনেকে মানসিক ভারসাম্য পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিলেন।
জুলফিকার আলি ভুট্টো যখন লাহোরের জেলে ছিলেন। সেই সময় বিবিসির সাংবাদিক ভিক্টোরিয়া সোফিয়েল্ড তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়কে ” ভুট্টো ট্রায়াল এন্ড এক্সিকিউশান” নামে একটি গ্রন্থের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। সেই গ্রন্থে লেখা আছে যে, লাহোর জেলে থাকাকালীন রোজ রাতে ভুট্টো ভয়ংকর আর্তনাদের শব্দ পেতেন, মনে হতো যেন কারুর হৃদপিন্ড বুকের ভেতর থেকে ছিড়ে বার করে নিয়ে আসা হচ্ছে। ভুট্টো প্রথমে ভেবেছিলেন যে হয় তো তাঁকে বিব্রত করার জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবে এইসব করা হচ্ছে। কিন্তু ভুট্টোর আইনজীবী কারাগার কতৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানতে পারেন যে সেখানে একাত্তরের যুদ্ধে ভারতীয় যুদ্ধবন্দী সেনাদের রাখা হয়েছে, এইসব সেনাদের ভারত ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়না। তাই রাত হলে এদের ওপর নির্মম অত্যাচার করে পাকিস্তান একাত্তরের হারের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে।
ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম গৌরবময় মুহূর্ত ছিল সেই দিনটি, যখন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ঢাকার রমনা রেস কোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও শেষ গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. খান নিয়াজি-র কাছ থেকে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর গ্রহণ করেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা ছিলেন ভারতের বিজয়ের প্রতীক, এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে আজও তিনি একজন বীর হিসেবে স্মরণীয়।
তবে যা খুব একটা জানা যায় না, তা হলো—১৯৯৯ সালে তিনিই প্রথমবারের মতো সরকারি রেকর্ডে নিখোঁজ সৈনিকদের ‘যুদ্ধে নিহত’ হিসেবে দেখানোর অযৌক্তিকতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন, সেই সময় যখন সংসদে সরকার নিজেই দাবি করছিল যে তারা পাকিস্তানের হেফাজতে রয়েছে। নিখোঁজ সৈনিকদের পরিবারের দুর্দশা অরোরাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল—যে পরিবারগুলো এক উদাসীন সরকারের কাছে দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, বোঝাতে চাইছিল যে পাকিস্তানের কাছে কেবল অনুরোধ জানিয়ে নয়, বরং আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অবসর গ্রহণের পর অরোরা সমাজসেবামূলক নানা জনস্বার্থ বিষয়ে সক্রিয় হন।
১৯৯৯ সালের মে মাসে, তিনি আরও কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে মিলে গুজরাট হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন, যাতে নিখোঁজ প্রতিরক্ষা কর্মীদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানানো হয়। তারা আদালতের কাছে দু’টি বিষয়ে হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন।
প্রথমত, যেসব সৈনিক নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের ‘সম্ভাব্য মৃত’ না ধরে বরং ‘কর্তব্যরত’ হিসেবে গণ্য করা হোক—অর্থাৎ বন্দি হওয়ার দিন থেকে তাঁদের অবসর গ্রহণের দিন পর্যন্ত তাঁরা কার্যত সক্রিয় দায়িত্বে রয়েছেন বলে ধরা হোক। তাঁদের যুক্তি ছিল—যদি সরকার ধরে নেয় যে নিখোঁজ ব্যক্তিরা জীবিত এবং পাকিস্তানের বন্দিদশায় আছেন, তবে তাঁদের পরিবারগুলো কেন কেবল পেনশন পাচ্ছে? তাঁদের বরং পূর্ণ বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, মহার্ঘভাতা ও অন্যান্য চাকরিসংক্রান্ত সুবিধার বকেয়া অর্থ পাওয়া উচিত, যেমনটি তাঁদের কর্মরত সহকর্মীরা পান। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান যে ভারতীয় সৈনিকদের অবৈধভাবে আটক রেখেছে এবং শিমলা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে, সেই অপরাধে তাকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের (UNHRC) সামনে জবাবদিহির মুখোমুখি করা উচিত।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা ২০০৫ সালে মারা যান, মামলার রায় ঘোষণার বহু আগেই। কিন্তু এই মামলা প্রায় বারো বছর ধরে গুজরাট হাইকোর্টে চলেছিল, এবং সেই সময় ভারতের সরকারকে এমন বহু বিষয়ে প্রকাশ্যে আসতে বাধ্য করেছিল যা এতদিন পর্যন্ত এক অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ধোঁয়াশার আড়ালে ঢাকা ছিল।
২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রণব মুখার্জির একটি বিবৃতি প্রকাশ করে:‘আনুমানিকভাবে বলা যায়, পাকিস্তানের জেলগুলোতে বর্তমানে ভারতের সতেরো জন সেনা কর্মকর্তা, দুইজন জুনিয়র কমিশনড অফিসার এবং উনিশজন অন্যান্য পদমর্যাদার সেনা বন্দি রয়েছেন।’ দুই সৈনিকের প্রত্যাবর্তন জনমনে প্রবল আগ্রহ ও কিছুটা ক্ষোভ সৃষ্টি করে, এবং পাকিস্তানের জেলে আটক ভারতীয় সৈনিকদের বিষয়টি সাময়িকভাবে সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়।
২০০৫ সালের জানুয়ারিতে, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভি.ভি. গিরির পুত্রবধূ মোহিনী গিরির নেতৃত্বাধীন ওয়ার উইডোজ অ্যাসোসিয়েশন (WWA) এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায়।
নয়াদিল্লিতে ‘বিটিং রিট্রিট’ অনুষ্ঠানের দুই দিন পর, ৩১ জানুয়ারি তারিখটি ভারত ও পাকিস্তানের ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধ-পরবর্তী নিখোঁজ সৈনিকদের স্মরণে পালন করা হয়। ‘জাতি হয়তো তাদের ভুলে গেছে, কিন্তু তাদের পরিবার নয়। তারা এখনও প্রিয়জনদের ফেরার আশায় বেঁচে আছে। নিশ্চয়ই ভারতীয় জেলগুলোতেও পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের একটি অনুরূপ তালিকা রয়েছে। তাহলে এখন কি সময় আসেনি এই মানুষগুলোকে ঘরে ফেরার?’—প্রশ্ন তুলেছিলেন মোহিনী গিরি।
বিভিন্ন সময় এইসব বীর যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের পাকিস্তানের কয়েকটি নির্বাচিত কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই সবই ছিলো মন রক্ষার্থে লোক দেখানো সাক্ষাৎকার। যার মাধ্যমে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
দুই মলাটের মাঝে এতো সংক্ষিপ্ত পরিসরের মধ্যে যতোটা সম্ভব আমি সেই সব সেনাদের ইতিহাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, যারা বিশ্বরাজনীতির অন্ধকার দাবার ছকের মাঝে হারিয়ে গিয়েছেন। এই গ্রন্থকে ঠিক উপন্যাস বলা যাবে না, ভীষণ তথ্য ভিত্তিক একটি দলিল বলা চলে। এই গ্রন্থের প্রধান চরিত্র দিল্লির খ্যাতনামা সাহিত্যিক আদা সুঁড়ির সাথে মরক্কোর একটি বিলাসবহুল রিসর্টে আলাপ হয় পাকিস্তানের বর্ষিয়ান সাংবাদিক আমন মালিকে। এরপর শুরু হয় এক অসম বয়সী বন্ধুত্বের ইতিবৃত্ত। সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরে আদা সুঁড়ি ১৯৭১ এর ভারত পাক যুদ্ধে নিখোঁজ তাঁর ছোটো কাকা মেজর অমিত সুঁড়িকে খুঁজতে পাকিস্তান যান। তারপর আদা মেজর অমিত সুঁড়ি এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের সম্পর্কে কী কী তথ্য খুঁজে পান, সেই সব কিছু নিয়েই ভারতের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের দলিল লিপিবদ্ধ করেছি।
‘৫৪-এর গন্ডির বাইরে’ বই টি প্রকাশ হবে বসাক ‘বুক স্টোর’ থেকে।