
সোমনাথ মন্দির ভগবান শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম হিসেবে পূজিত হয়। এই মন্দির কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এটি ভারতের ধর্ম, সংস্কৃতি ও অটুট বিশ্বাসের জীবন্ত প্রতীক। সোমনাথ মন্দিরের ইতিহাস প্রমাণ করে, সময়, আক্রমণ কিংবা ধ্বংস কোনও কিছুই বিশ্বাসকে মুছে ফেলতে পারে না। ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার নামই সোমনাথ।
আজ থেকে ঠিক এক হাজার বছর আগে, ১০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি আফগান শাসক মাহমুদ গজনবি সোমনাথ মন্দিরে আক্রমণ চালান। প্রভাস পাটনে পৌঁছে তাঁর সেনাবাহিনী এবং রাজপুত যোদ্ধাদের মধ্যে টানা আট দিন ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। প্রায় ৫০ হাজার হিন্দু যোদ্ধা মন্দির রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করেন। পরাজয়ের পর মাহমুদ গজনবি মন্দির লুণ্ঠন করেন এবং শিবলিঙ্গ ভেঙে ফেলেন। তিনি সোমনাথ মন্দির লুঠ করে প্রায় ২০ মিলিয়ন দিনার নিয়ে যান।
এই ধ্বংসই শেষ ছিল না। সোমনাথ মন্দির মোট ১৭ বার আক্রমণের শিকার হয়েছে। প্রতিবারই কোনও না কোনও হিন্দু শাসক বা ভক্ত সমাজ আবার মন্দির পুনর্গঠন করেছে। ১১৬৯ সালের শিলালিপি অনুযায়ী, গুজরাটের রাজা কুমারপাল মূল্যবান পাথর এবং রত্নখচিত এক বিশাল মন্দির নির্মাণ করেন।

তারপর ১৩ শতকে আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি উলুঘ খান গুজরাট আক্রমণের সময় আবার সোমনাথ ধ্বংস করেন। ১৩৯৫ সালে গুজরাটের সুলতান জাফর খান এবং ১৪১৪ সালে আহমেদ শাহ মন্দিরে লুটপাট চালান। ১৫ শতকে মাহমুদ বেগদা সোমনাথ মন্দিরকে মসজিদে রূপান্তরের চেষ্টা করেন। সর্বশেষ বড় ধ্বংস আসে ১৭০৬ সালে, যখন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মন্দির সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।
তবুও সোমনাথ মন্দির ইতিহাসে অতুলনীয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, সত্যযুগে চন্দ্রদেব সোনা দিয়ে এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ত্রেতাযুগে রাবণ রূপা দিয়ে, দ্বাপরযুগে ভগবান কৃষ্ণ চন্দন কাঠ দিয়ে পুনর্নির্মাণ করেন। যুগে যুগে ধ্বংস হলেও এই মন্দিরের ওপর বিশ্বাস কখনও ভাঙেনি।
ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে ১৭৮৭ সালে মহারাণী অহল্যাবাঈ হোলকর শেষবার এই মন্দির সংস্কার করেছিলেন। স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সোমনাথ পুনর্নির্মাণের দৃঢ় সংকল্প নেন। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ বর্তমান সোমনাথ মন্দিরের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমান সোমনাথ মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সোমনাথ মন্দিরের ৭৫ বছর পূর্তিকে ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব’ নাম দিয়েছেন।
১১ জানুয়ারি রবিবার গুজরাতে ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব’-এর মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “সোমনাথ মন্দির যুগ-যুগ ধরে মানুষের আস্থা, শক্তি ও সাহসের প্রতীক। এর ঐতিহ্য আমাদের পথ দেখায়। ১০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবার হামলা হয়েছিল সোমনাথ মন্দিরে। এরপর থেকে থেকেই বহুবার এই পবিত্র স্থান আক্রান্ত হয়েছে, তবু প্রতিবারই নতুনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সোমনাথ।
মাহমুদ গজনী থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত বহু আক্রমণকারী সোমনাথ মন্দির ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে ‘সোমনাথ’ নামের মধ্যেই রয়েছে ‘সোম’, যার অর্থ অমৃত।
যতবারই এই মন্দির ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে, ততবারই তা নতুন করে জেগে উঠেছে। ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেলেও সোমনাথ মন্দির আজও গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। হাজার বছর আগের পরিবেশ ও ইতিহাস আজও এই পবিত্র স্থানে অনুভব করা যায়।
এখানকার পূর্বপুরুষরা তাঁদের জীবন বাজি রেখে বিশ্বাস, আস্থা এবং মহাদেবের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন। একসময় অত্যাচারীরা ভেবেছিল তারা ভারতকে পরাজিত করেছে, কিন্তু হাজার বছর পর আজ সোমনাথ মহাদেব মন্দিরের চূড়ায় উড়তে থাকা পতাকা গোটা বিশ্বকে ভারতের শক্তি ও সামর্থ্যের বার্তা দিচ্ছে।
সোমনাথের ইতিহাস ধ্বংস বা পরাজয়ের নয়, বরং জয় ও পুনর্গঠনের ইতিহাস। ভারতে সোমনাথের মতো বহু পবিত্র স্থান রয়েছে, যা হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে এবং জাতির শক্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।
তবে স্বাধীনতার পর এক শ্রেণির মানুষ দাসত্বের মানসিকতা নিয়ে এই ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, মন্দির সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আক্রমণের কঠিন ইতিহাস বহুবার চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
যাঁরা সোমনাথ মন্দির রক্ষায় লড়েছিলেন, তাঁদের কৃতিত্বও প্রাপ্য সম্মান পায়নি। হামলারীদের হিংসা ও ধ্বংসযজ্ঞকে পাঠ্যবইয়ে শুধু ‘লুটপাট’ নামে বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু বর্বরতা ও নিপীড়নের অধ্যায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
সোমনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণ নিয়েও নানা বাধা এসেছিল। স্বাধীনতার পর সর্দার বল্লভভাই পাটেল যখন মন্দির পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেন, তখনও আপত্তি তোলা হয়। ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের মন্দিরে উপস্থিতি নিয়েও বিরোধ ছিল।

তখন যারা বাধা দিয়েছিল তারা আজও সক্রিয়, শুধু অস্ত্রের বদলে এসেছে গোপন ষড়যন্ত্র।
যে কোনও বিভাজনের শক্তিকে পরাজিত করতে হবে। গত হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের আগামী হাজার বছরের প্রস্তুতি দেয়।
সোমনাথ শুধু একটি মন্দির নয়- এটি ভারতের শক্তি, সহিষ্ণুতা, বিশ্বাস ও সভ্যতার প্রতীক।
১০২৬ সালে মাহমুদ গজনির প্রথম আক্রমণের পর বহুবার ধ্বংস হলেও মানুষের বিশ্বাসে সোমনাথ কখনও হারায়নি। প্রতিবারই নতুন করে নির্মাণ হয়েছে যা বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল। স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির দেখে পুনর্নির্মাণের সংকল্প করেন সর্দার পাটেল। সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় সেই কাজ সম্পূর্ণ হয় ১৯৫১ সালে, তখন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ মন্দির পুনঃস্থাপনার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ২০২৬ সালে সেই ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণের ৭৫ বছর পূর্ণ হবে। আজ আরব সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা আদি জ্যোতির্লিঙ্গ সোমনাথ ভারতের আত্মসম্মান ও সাংস্কৃতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে নতুন বার্তা দিচ্ছে।”