বান্দরবানে দারিদ্রতার সুযোগে আদিবাসীদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকর।

ছবি: ভুক্তভোগী শিশুরা।

বান্দরবান জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আদিবাসী জুম্মদের বিশেষ করে ম্রো, ত্রিপুরা এবং কতিপয় চাকমা জাতিগোষ্ঠীকে দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরকরণের প্রক্রিয়া এখনো জোরদার রয়েছে। আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, গৃহ নির্মাণ, গরু-ছাগল পালন, সুদ-মুক্ত ঋণ ইত্যাদি লোভ লালসা দেখিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ চলছে।

পড়াশুনা করানোর লোভ দেখিয়ে ছোট ছোট কোমলমতি ছেলে মেয়েদের ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার সহ বান্দরবানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় নিয়ে পরিবারের অজান্তে ভর্তি করিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ এবং নিজ জাতি গোষ্ঠীর নাম, পোশাক পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে।

এর আগেও একাধিক অনুসন্ধানী রিপোর্টে বান্দরবানে বিভিন্ন উপজেলায় আদিবাসী জুম্মদের দারিদ্র্যতা, অর্থনৈতিক সুবিধা ও শিশুদের শিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন জুম্ম পরিবার ও শিশুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্রের সাথে একাধিক বহিরাগত বাঙালি মুসলিম এবং নও মুসলিম জড়িত থাকার কথা উঠে এমনকি এই ধর্মান্তরকরণ নেতৃত্বের পেছনে তাদের হাত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

তারা হলেন, মাওলানা একে এম আইয়ুব খান, জেএমবি শামীম (মোঃ ইউসুফ আলী), হাফেজ মাওলানা সালামাতুল্লাহ, ফরিদ আহম্মদ, আবুলকালাম, মোঃ জাহিদ, সাহাব উদ্দিন, মাওলানা ইমরান হাবিবি, মোহাম্মদ আইয়ুব প্রমুখ এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অপরদিকে আদিবাসী থেকে ধর্মান্তরিত যেসব নও মুসলিম এসব ধর্মান্তরকরণের সাথে জড়িত তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা হলেন-জনৈক চাকমা ধর্মান্তরিত মুসলিম মোঃ শহিদ, মৌলভী হেলাল উদ্দিন ত্রিপুরা, মুসলিম পাড়া মডেল একাডেমির শিক্ষক ধর্মান্তরিত মুসলিম সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা, আবু বক্কর ছিদ্দিক (পূর্ব নাম অতিরম ত্রিপুরা), খাগড়াছড়ির মোঃ আব্দুর রহিম (পূর্ব নাম ভিনসেন্ট চাকমা), মোঃ আব্দুর রহমান (পূর্ব নাম ভন্দ চাকমা), মোঃ ইব্রাহিম (পূর্ব নাম ভবাৎ চাকমা) প্রমুখ।

বিভিন্ন সূত্র মোতাবেক, উক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমানে জেএমবি শামীম (মোঃ ইউসুফ আলী) এবং মুসলিম পাড়া মডেল একাডেমির শিক্ষক ধর্মান্তরিত মুসলিম সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা এই ধর্মান্তরকরণ চক্রের অন্যতম হোতা।

মোঃ ইউসুফ আলীর গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়, তবে বর্তমানে কক্সবাজারে থাকেন। সেখানে ঈদগাহ মডেল হসপিটাল ও ডায়াবেটিস কেয়ার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আবাসিক সার্জন হিসেবে দায়িত্বে আছেন।

জানা গেছে, তিনি অত্যন্ত সুক্ষভাবে ও সুকৌশলে বান্দরবানের আলিকদমসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন সেখানে আদিবাসী জুম্মদের ধর্মান্তরিতকরণে সক্রিয়ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা, বুদ্ধি-পরামর্শ ও পৃষ্টপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে, তিনি যেহেতু নিজে একজন চিকিৎসক এবং আর্থিকভাবে সমর্থ, সেকারণে অনেক সময় বিনা পয়সায় চিকিৎসার নামে অথবা কিছু আর্থিক সহযোগিতার নামেও আদিবাসীদের ধর্মান্তরিতকরণ করছেন এবং তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ধর্মান্তরিত মুসলিম সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা।

এই ইউসুফ আলীর নেতৃত্বেই আলিকদমের ধর্মান্তরিত আদিবাসী মুসলিমদের ‘ইসলামপুর’ নামক মুসলিম পাড়ায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়। সেখানে তিনি তার নেতৃত্বে কক্সবাজারের বায়তুশ শরফ থেকে ডাক্তারদেরকে নিয়ে এসে মাঝে মধ্যে বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থারও আয়োজন করেন।

তারা বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলার দুর্গম এলাকার আদিবাসীদের অভাব-অনটনের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং গরীব-অশিক্ষিত আদিবাসীদের ধর্মান্তরের জন্য এফিড্যাভিটসহ আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করছেন।

বর্তমানে বান্দরবান পৌরসভা, আলিকদম, রোয়াংছড়ি, লামাসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টির অধিক জুম্ম মুসলিম পাড়া বা বসতি রয়েছে। এইসব ধর্মান্তরিত জুম্ম মুসলিমদের বলা হচ্ছে ‘নও মুসলিম’ বা ‘উপজাতি মুসলিম’। এই ধর্মান্তরিত মুসলিম বসতিগুলোকে ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করে এবং কিছু বাছাইকৃত নও মুসলিমকে সুবিধা দিয়ে তাদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সহজ সরল জুম্মদের ধর্মান্তরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য, বিগত ২০১০ সাল থেকে বর্তমান অবধি পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্মদের মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই মাত্রা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে জুম্মদের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে শিশুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে।

বিভিন্ন তথ্য মোতবেক, ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশ কর্তৃক কেবল বান্দরবান শহরের এক মোটেল ‘অতিথি বোর্ডিং’ থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ৩৩ শিশুকে উদ্ধার করে। বান্দরবানের থানচি উপজেলা থেকে এই শিশুদের সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ধানমন্ডী আদর্শ মদিনা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভন দেখিয়ে।

২০১২ সালের জুলাই মাসে গাজীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে ১১ জন আদিবাসী ত্রিপুরা শিশুকে উদ্ধার করা হয়।

২ জানুয়ারি ২০১৩ পুলিশ ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন আবুযোর জিফারি মসজিদ কমপ্লেক্স নামের এক মাদ্রাসা থেকে ১৬ আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করে। শিশুদের জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়।

১ জানুয়ারি ২০১৭ ঢাকায় এক মাদ্রাসায় পাচার হওয়ার সময় পুলিশ বান্দরবান শহরের ‘অতিথি আবাসিক হোটেল’ থেকে চার আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করা হয়।

গত ২২ জানুয়ারি ২০২১ একদল সচেতন ম্রো ছাত্র স্থানীয় এনজিওকর্মী ও সমাজকর্মীদের সহযোগিতায় কক্সবাজারের ‘ঈদগাহ উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংঘ’ নামক এক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ আদিবাসী ম্রো শিশুকে শিশুদের উদ্ধার করা হয়। বিনা খরচে থাকা, খাওয়া, লেখাপড়ার খরচ এর ব্যবস্থা ও আর্থিক সহযোগিতার প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও সহজ-সরল ম্রো পরিবারের কাছ থেকে এই শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের বিভিন্ন মাদ্রাসায় রেখে আযানসহ ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন শিক্ষা দেওয়া হয়। এই সময় শিশুদের পড়ানো হয় ইসলামী পোশাক। এক পর্যায়ে এই শিশুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়। পরিবার বা তাদের অশিক্ষিত পিতা-মাতা মনে করেন, তাদের ছেলেমেয়েরা দেশের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।

সর্বশেষ, ২০২৩-২০২৪ সালে সচেতন ম্রো শিক্ষার্থীর একটি টিম ‘ইক্বরা তাহসীনুল কুরআন মাদ্রাসা’ ধর্মান্তরিত হতে যাওয়া প্রথম ধাপে ১৪ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে ৯ জনসহ মোট ২৩ জন ম্রো শিশুকে উদ্ধার করা হয়। যেখানে উক্ত মাদ্রাসায় মোট ৩০ জন ম্রো ও ত্রিপুরা শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়।

আরো উল্লেখ্য যে, বান্দরবানে ইতোমধ্যে ‘উপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘ’, ‘উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা’ ও ‘উপজাতীয় আদর্শ সংঘ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি সংগঠনের নামে বেশ কয়েকটি উপজাতীয় নুও মুসলিম বসতি স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত সংগঠনসমূহের মাধ্যমে জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করে ইসলামীকরণ করা এবং পার্বত্যাঞ্চল থেকে জুম্মদের জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের অন্যতম অংশ হিসেবে এই ধর্মান্তরিতকরণ প্রক্রিয়া শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক চলমান রয়েছে। বস্তুত, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই এই ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তবে এই কার্যক্রম আরও জোরদার হয় আশির দশকের শুরুতে ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেশের সমতল অঞ্চল থেকে ৪-৫ লক্ষ বহিরাগত সেটেলার বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে জুম্মদের জায়গা-জমিতে বসতিদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৮০ সালের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার লংগদুতে সৌদি আরব ও কুয়েতের অর্থায়নে স্থাপন করা হয় ইসলামিক মিশনারী সংগঠন ‘আল রাবিতা’। এর রয়েছে হাসপাতাল ও কলেজ।

কার্যত এর প্রদান উদ্দেশ্য ইসলামী ভাবধারাকে সম্প্রসারিত করা, সেটেলার বাঙালিদের সহায়তা এবং আদিবাসী জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের প্রচেষ্টা চালানো। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক দেখা যায় মূলত জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথে।

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রকাশিত ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে মসজিদের সংখ্যা বর্তমানে ৩,৭৬৩টি, যার মধ্যে বান্দরবানে ২,০৭০টি, রাঙামাটিতে ১,০৫৯টি এবং খাগড়াছড়িতে ৬৩৪টি। যার দ্বারা প্রমাণিত হয় ধর্মান্তরিতকরণের ফলাফল বা পরিণতি যে আদিবাসী জুম্মদের সংখ্যালঘুকরণ, তাদের উপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা তাদের সংস্কৃতি ধ্বংসকরণ, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনধারায় ক্ষতিসাধন, জুম্ম অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণতকরণ, সর্বোপরি জুম্মদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে জাতিগতভাবে বিলুপ্তকরণেরই নামান্তর তা বলাইবাহুল্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *