
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সংঘ বা আরএসএস এর কি ভূমিকা ছিলো তা নিয়েই শেখর ভারতীয় এর লেখা বই ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে সংঘ’।
লেখক শেখর ভারতী তার এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে সংঘ’ বই সম্পর্কে বলেন,
দেখবেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ নিয়ে কিছু লিখলেই কিছু জন এসে প্রশ্ন করবে, কজন শহিদ হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে?
শহিদ না হলে তাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামী নন? যারা অনুশীল সমিতির গুপ্তচর, আশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করতেন তাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামী নন? নিজের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে কতটা অজ্ঞ হলে এ ধরণের প্রশ্ন করা যায়। যাই হোক আপনাদের দোষ নেই। আপনি-আমি বামপন্থী ও কংগ্রেসী ন্যারেটিভ শুনে পড়ে ও দেখে বড় হয়েছি, আপনাদের আর দোষ কী। এই ন্যারেটিভ ও মিথ ভেঙে সত্যিটা আনার জন্যই এই বই।
শহিদ না হয়ে, কালাপানি-জেলে না গিয়েও দেশের টপমোস্ট কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম বলি বরং!
- কংগ্রেসের যে কোনও বড় নেতা।
- মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী
- সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
- জওহরলাল নেহরু
- মোতিলাল নেহরু
এঁরা কেউ শহীদ হননি, এঁরাও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাই শহিদ না হলে স্বাধীনতা সংগ্রামী নয় এমনটা ভাবা মূর্খামি।
স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা শহিদ হয়েছেন তাঁরা অমর, তাঁদের লড়াই অভূতপূর্ব, তাঁরা মহান৷ কিন্তু সবাই শহিদ হয়ে গেলে দেশ স্বাধীন হত না৷ প্রত্যেকের নিজস্ব লড়াই আছে স্বাধীনতা সংগ্রামে।
তাও খুব অল্প নলেজের শেখানো বুলিকে বুস্ট করতে আপাতত একটা নাম বলে দিই কেমন যিনি RSS স্বয়ং সেবক ছিলেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ব্রিটিশরা।
১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে বিদর্ভের চিমুর-আশতি অঞ্চলে RSS স্বয়ং সেবকরা ব্রিটিশ বিরোধী সহিংস আন্দোলনে অংশ নেন৷ কয়েকজন ব্রিটিশ মারা যায়। এই ঘটনা ‘চিমুর আশতি এপিসোড’ নামে পরিচিত। এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার অভিযোগে কেশব দেশ পাণ্ডে বা বালাসাহেব দেশপাণ্ডেকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ব্রিটিশ সরকার। পরে সাক্ষীর অভাব ও স্থানীয় এক উকিলের কৌশলের সাহায্যে মুক্তি পান তিনি৷ পরে যিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের বনবাসী কল্যাণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। যে আশ্রম এখনও প্রত্যন্ত গ্রামে জঙ্গলে পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ করে চলেছে৷
এবার এই কেশব দেশপাণ্ডেদের কথা আপনি জানেন না কেন? কেন ইতিহাসে পড়েননি? আমি কি গল্প লিখছি, নতুন বানানো ইতিহাস লিখছি?
১. কারণ, আপনি-আমি কংগ্রেস-বাম শাসক ঘনিষ্ঠদের লেখা ইতিহাস বই পড়েছি৷ তাঁরা তাঁদের আদর্শকে গ্লোরিফাই করে এরকম লোকদের প্রথম সারিতে রেখেছেন।
ঠিক যে কারণে ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা মীর নিশার আলি বাংলার ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে গিয়েছেন৷ যার সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের কোনও দূর দূর যোগ ছিল না৷ আবার অনুশীল সমিতিতে মা কালীর সামনে শপথ, গীতাপাঠ, হিন্দুরীতির পালন এসব বাদ গিয়েছে ইতিহাস বই থেকে।
কংগ্রেসের শাসন কায়েম রাখতে শ্রদ্ধেয় সাভারকরকে ভিলেন বানানোটা সময়ের দাবি ছিল ৷ গান্ধী-নেহরুর মতো একজন বড় কংগ্রেসী নেতার নাম বলতে পারবেন যাকে ব্রিটিশরা কখনও কালাপানিতে পাঠায়? সেলুলার জেলে পাঠায়? ১১ বছর তো ছেড়ে দিন, ১১ দিন? ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কেউ একজন?
সাভারকরকে কালাপানিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশরা৷ ১১ বছর একটা সাড়ে আটফুটের ঘরে ব্রিটিশরা বন্দি রেখেছিল সাভারকরকে। তাও ২৬-২৭ বছর বয়স থেকে। দেশমাতৃকার জন্য এই ত্যাগ এই নির্যাতন সহ্য করার সঙ্গে আগা খান প্যালেসে চাকর-বাকর-মালি-রাধুঁনি নিয়ে ছুটি কাটাতে যাওয়া গৃহবন্দি অবস্থার তুলনা চলে না৷
তাই সাভারকরকে ইতিহাস বইতে ছোট করা ছিল সময়ের দাবি। একই রকমভাবে সুভাষচন্দ্র বোসকে মৃত দেখানোও ছিল কংগ্রেসী-বাম শাসন শুরুর প্রাথমিক ও প্রধান শর্ত।
২. আরএসএস প্রতিষ্ঠা হয় নাগপুরে। বাংলা থেকে অনেকটা দূরে। প্রাথমিক ভাবে তাঁদের কর্মক্ষেত্র ছিল মহারাষ্ট্র ও আশেপাশে৷ তাই বাংলার ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস পাওয়াটা কষ্টসাধ্য। আপনি আমি বাংলার মানুষ তাই ইতিহাস নিয়ে খুব আগ্রহ না থাকলে নিজে থেকে খুঁটিয়ে কেউই এতটা পড়তে যাবো না । ঠিক এ কারণেই আমাদের অনেকে চিমুর আশতি এপিসোডের নামই শুনিনি।
৩. এছাড়াও, এই তথ্যগুলো বাম-কংগ্রেসী ইতিহাসবিদদের বইতে পাবেন না কিন্তু এর উল্লেখ স্থানীয়ভাবে সরকারি ডকুমেন্টে রয়েছে৷ রয়েছে বিপ্লবীদের লেখাতেও।
অনুশীলন সমিতির বিপ্লবী ছিলেন ক্ষীরোদকুমার দত্ত (এই নামটাও অচেনা লাগতে পারে। বাম-কংগ্রেসী ইতিহাস বইতে এঁকে গ্লোরিফাই করা নেই নেহরুর মতো) এই ক্ষীরোদকুমার দত্তের লেখা বই হল ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অনুশীল সমিতি’ – এই বইয়ের ১২৮ নং পাতায় প্রথম ও দ্বিতীয় লাইনে ক্ষীরোদকুমার দত্ত লিখছেন, ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের নেতা শ্রী কেশব হেডগেওয়ার তাঁর ৬০ হাজার স্বয়ং সেবক সহ সশস্ত্র আন্দোলনে যোগ দিতে প্রস্তুত৷’
এই যে সশস্ত্র আন্দোলনের কথা তিনি নিজের বইতে লিখছেন সেটার প্রচেষ্টা কার ছিল জানেন? স্বয়ং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের। উনি শ্রদ্ধেয় ডক্টর হেডগেওয়ারের কাছে বিপ্লবীদের পাঠান। সে নিয়ে তথ্য ও প্রমান সহ বইতে লিখেছি বিস্তারিত, এগুলো এখনও রয়েছে বিপ্লবীদের চিঠি, ডায়রি ও বিপ্লবীদের লেখা বইতে, এগুলোই তুলে আনার চেষ্টা করেছি এই বইতে।
আমি কোনও ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ করিনি৷ বই লিখেছি, তাতেও অনেকের এমন মনে হচ্ছে যেন বোমা ফাটিয়েছি৷ যাই হোক বইটা প্রকাশের পর তথ্যগত ভুল থাকলে তার প্রমান সহ সোশাল মিডিয়াতে তো লিখতেই পারবেন৷ আমাকেও জানাতে পারবেন, পাল্টা বই লিখতে পারবেন, অসুবিধে কোথায়। আমার বই তো আর সেই বিশেষ বইটির মতো নয়, যে সমালোচনা করতে এলে কল্লা যাবে?
বইটা পড়ুন আগে, ভুল থাকলে তথ্যগত ত্রুটি থাকলে সমালোচনা করুন, মিটে গেল।
ভয় পাচ্ছেন কেন?
বই – স্বাধীনতা সংগ্রামে সংঘ
লিখেছেন – শেখর ভারতীয়
প্রকাশক – বইবন্ধু পাবলিকেশন
প্রচ্ছদ – দেবজান মুখার্জী