ইসলামীয় আতঙ্কে কাঁটা ইউরোপ!

ছবি: ইসলামীয় আতঙ্কে কাঁটা ইউরোপ!

অবৈধ অনুপ্রবেশের জেরে বদলাচ্ছে সমাজ-সংস্কৃতি, স্পেনে ‘সর্বহারা’র স্রোতে ‘ইসলামীয় আতঙ্কে’ কাঁটা ইউরোপ!

স্পেনের সেউতায় কাতারে কাতারে মরক্কোবাসীর অবৈধ অনুপ্রবেশের খবর প্রকাশ্যে আসতেই ‘ইসলামিকরণের আতঙ্কে’ ভুগছে ইউরোপের একাধিক দেশ। আর তাই সীমান্তে কড়া পদক্ষেপের আর্জি জানাচ্ছে তারা।

শান্ত শহরে হঠাৎই জনবিস্ফোরণ! হুড়মুড়িয়ে সেখানে ঢুকছে কাতারে কাতারে মানুষ। কেউ আসছেন সমুদ্রে সাঁতরে। কেউ আবার নৌকায় পৌঁছেছেন বেলাভূমিতে। তার পর জোয়ারের ঢেউ আটকানোর বাঁধ ও বেড়াজাল টপকে নগরে প্রবেশ। কে নেই তাতে! শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে প্রবীণ নাগরিক। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা অন্তত ৬০ হাজার। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই ‘ইসলামিকরণের ভয়ে’ আতঙ্কিত ইউরোপ।

তারিখ ২৯ জুলাই, সাল ২০২৬। ওই দিন অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে খবরের শিরোনামে আসে স্পেনীয় শহর সেউতা। মরক্কো থেকে হঠাৎই পিল পিল করে লোক ঢুকতে থাকে সেখানে। বাধ্য হয়ে সেনা নামায় মাদ্রিদ। ইতিমধ্যেই বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের ৫০ হাজার জনকে ফেরত পাঠিয়েছে ফৌজ। তার পরেও ঘটনার অভিঘাত যে ইউরোপ সামলে নিয়েছে, এমনটা নয়।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেউতা স্পেনের মূল ভূখণ্ডের অন্তর্গত নয়। ৭.৫ বর্গমাইল আয়তন বিশিষ্ট এই এলাকাটি মরক্কোর একেবারে উত্তরাংশে অবস্থিত। এর গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে জিব্রাল্টার প্রণালী। বর্তমানে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা মাত্র ৮৪ হাজার। অর্থাৎ, গত ২৯ জুলাই মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি বেআইনি অনুপ্রবেশের সাক্ষী হয় মাদ্রিদ নিয়ন্ত্রিত সৈকত-শহর।

সেউতায় অবৈধ ভাবে মরক্কোবাসীর ঢোকা কোনও নতুন খবর নয়। ২০২১ সালে একই কায়দায় সেখানে পা রাখেন উত্তর আফ্রিকার অন্তত ১০ হাজার বাসিন্দা। তবে এ বারের ঘটনা নজিরবিহীন। কারণ, একে ইতিহাসের বৃহত্তম বেআইনি অনুপ্রবেশ হিসাবে দেখছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সাঞ্চেজ়।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরে উদার অভিবাসন নীতি নিয়ে চলছে মাদ্রিদের বামপন্থী সরকার। তার উপর এ বছরের জুনে বেআইনি অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত মামলায় বিস্ফোরক রায় দেয় সেখানকার সর্বোচ্চ আদালত। তাতে বলা হয়, চোরাপথে ঢুকে পড়া কোনও ব্যক্তিকে তড়িঘড়ি ফেরত পাঠানো যাবে না। সেই আইনের ফাঁক গলে সেউতায় প্রবেশ করতে চাইছেন মরক্কোর নাগরিকদের একাংশ।

অন্য দিকে, অবৈধ অনুপ্রবেশকে ‘ইসলামিকরণ’-এর সমার্থক হিসাবে দেখছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর দেশগুলির যুক্তি, এর জেরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে মৌলবাদও। ফলে ধীরে ধীরে মুক্তমনা শ্বেতাঙ্গরাই হয়ে পড়ছেন সংখ্যালঘু। ধর্মাচরণ, পোশাক, খাওয়া-দাওয়া থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি, সব কিছুই হারাতে বসেছেন তাঁরা।

বর্তমানে এই সমস্যা ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানিতে চরম আকার নিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে মাথাচাড়া দিচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। পাশাপাশি, লাগাতার উত্থান হচ্ছে কট্টর দক্ষিণপন্থীদের। উদাহরণ হিসাবে প্রথমেই ফ্রান্সের কথা বলা যেতে পারে। সেখানকার মুসলিম জনসংখ্যা ৫৫-৬৫ লক্ষের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যেটা পশ্চিম ইউরোপে বৃহত্তম।

বর্তমানে ফ্রান্সের মোটা জনসংখ্যার ৮-১০ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এঁদের বড় অংশই উত্তর আফ্রিকার আলজিরিয়া, মরক্কো, তিউনিশিয়া এবং সাহারা মরুভূমি এলাকা থেকে চোরাপথে ঢুকেছে পশ্চিম ইউরোপের ওই দেশে। একই ছবি জার্মানিরও। সেখানকার মুসলিম জনসংখ্যা ৫৫-৭০ লাখ, যেটা দেশটির মোট বাসিন্দার ৬.৫-৮.৫ শতাংশ। জার্মানিতে আবার সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাকের শরণার্থীরাও রয়েছেন।

ব্রিটেনে বসবাসকারী মুসলিমের সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে, যেটা দ্বীপরাষ্ট্রের মোট জনতার ৬.৫ শতাংশ। ইসলাম সেখানকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। ব্রিটিশ মুসলিমদের ৬৬ শতাংশের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের কোনও না কোনও যোগসূত্র রয়েছে। বাকিরা সোমালিয়া, নাইজ়েরিয়া, লিবিয়া, মরক্কো, আলজ়েরিয়া, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক এবং সাইপ্রাস থেকে এসেছেন বলে জানা গিয়েছে।

মুসলিমদের এ-হেন সংখ্যাবৃদ্ধিতে ইউরোপীয় দেশগুলিতে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো রাষ্ট্রে গজিয়ে উঠছে একের পর এক মাদ্রাসা। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় শিক্ষা, মসজিদ নির্মাণ, হিজাব এবং শরিয়া আইনের উপর জোর দিচ্ছেন। ফলে মূল্যবোধের সংঘাতে ভুগছে ইউরোপ। তার প্রভাব আর্থিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে যে পড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

আর তাই ইতিমধ্যেই বিশেষ আইন পাশ করে হিজাব, বুরখা এবং মসজিদে বিদেশি অর্থ প্রদানের মতো বিষয়গুলির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও ডেনমার্ক। এই তিন দেশের বহু রাজনৈতিক নেতাকেই ‘ইসলামিকরণের’ খারাপ দিকটার কথা বলতে শোনা গিয়েছে। ড্যানিশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল আবার জানিয়েছে, রাষ্ট্রের উন্নতিতে যত কম মুসলিম থাকে ততই ভাল।

এই পরিস্থিতিতে স্পেনের অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেরিল্যান্ডে মন্ত্রিসভার বৈঠক সেরে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘‘সেউতার ভিডিয়ো দেখে মনে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ একটি দেশ আক্রমণ করেছে। আমেরিকায় রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচিত না হলে আমাদের সঙ্গে ঠিক এই ঘটনাই ঘটবে। এবং সেটা হবে আরও ভয়াবহ।’’

অন্য দিকে স্পেন নিয়ে মন্তব্য করেছেন ধনকুবের শিল্পপতি ইলন মাস্কও। নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, ‘‘বেআইনি অনুপ্রবেশের জেরে মাদ্রিদের অর্থনীতি ধ্বংস হতে চলেছে। অবিলম্বে অভিবাসী নীতিতে বদল প্রয়োজন।’’ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন কট্টর দক্ষিণপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির নেতা অ্যালিস ভাইডেল।

একই ভাবে মরক্কো থেকে সেউতায় হাজারে হাজারে বেআইনি অনুপ্রবেশ ইউরোপের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। এ প্রসঙ্গে জার্মান নেতা অ্যালিস এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘‘এক রাতে স্পেনের সৈকত শহরকে আমরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখলাম। সেখানকার শরণার্থীরা বার্লিনেও যেতে পারেন। আর তাই সীমান্ত সুরক্ষায় জোর দেওয়া উচিত।’’

ইউরোপীয় নেতাদের এই ভয় অমূলক নয়। ইইউ-এর সদস্য হওয়ার কারণে ভিসার ব্যাপারে মাদ্রিদ বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। সেখান থেকে এই গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলিতে যেতে আলাদা করে কোনও নথির প্রয়োজন নেই। এই আইনের সুযোগ নিয়ে শরণার্থীরা যে ফ্রান্স, জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন বা ইটালিতে ছড়িয়ে পড়তে পারেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই ভয়ে স্পেনকে ভিসামুক্তর তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও উঠতে শুরু করেছে।

বেআইনি শরণার্থী সমস্যার সমাধানের জন্য ইতিমধ্যেই একসুরে কথা বলছেন ইউরোপের চার রাজনৈতিক নেতা। তাঁরা হলেন, ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, জার্মান চ্যান্সেলার ফ্রিডরিখ মেয়ার্ৎজ় এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। এ ব্যাপারে পদক্ষেপের জন্য চলছে সই সংগ্রহ। ফলে একসঙ্গে ২২টি দেশ ইইউয়ের সংসদে কড়া আইনের আবেদন করতে পারে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।

বেআইনি অনুপ্রবেশের সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্রিটেনে ধীরে ধীরে ‘পপুলিস্ট রিফর্ম পার্টি ইউকে’ নামের একটি দলের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে অতীতে উদারনৈতিক কাঠামো থেকে কিছুটা সরে এসেছে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সরকার। ফলে বহু সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শরণার্থীরা। যদিও এখনও কোনও কঠোর আইন পাশ করেনি সংশ্লিষ্ট দ্বীপরাষ্ট্র।

বিশেষজ্ঞদের অবশ্য দাবি, ‘ইসলামিকরণের ভীতি’ থাকলেও স্পেনের পক্ষে শরণার্থী সমস্যা রাতারাতি মিটিয়ে ফেলা বেশ কঠিন। কারণ, পশ্চিম ইউরোপের এই দেশটির জনসংখ্যা অত্যন্ত কম। আর তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকের অভাব পূরণ করতে অভিবাসীদের সাদরে আমন্ত্রণ করে থাকে মাদ্রিদ। সেউতা কাণ্ডের পর সেখান থেকে তারা সরে আসে কি না, সেটাই এখন দেখার।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সাঞ্চেজ় অবশ্য এই অনুপ্রবেশকে ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছেন। সেউতা কাণ্ডের সঙ্গে মানবপাচারের যোগ আছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। ইউরোপের ‘ইসলামিকরণের’ ভয়ে আগামী দিনে শরণার্থী সঙ্কটে কড়া পদক্ষেপ করবেন পেদ্রো? তার উত্তর দেবে সময়।

সূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *