
রামায়ণ পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য। এই মহাকাব্যটি শুধুমাত্র একটি কাব্য নয়, ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষসহ চার প্রাকারের পুরুষার্থের সকল বিষয় এ মহাকাব্যে সুবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্র বিভিন্ন প্রসঙ্গে অনন্য শিক্ষা দিয়েছেন। শ্রীরামচন্দ্রের এই শিক্ষা জগতকে আজও প্রেরণা দেয়। এই অনন্য শিক্ষার মধ্যে, অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো, মৃত্যু পরবর্তীতে কারো সাথে বিদ্বেষ না করা। রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডে রাবণকে হত্যার পরে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বিভীষণকে নির্দেশ প্রদান করেন অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধার সাথে রাবণের পারলৌকিক কৃত্যাদি সম্পন্ন করতে। অসুররাজ রাবণের জীবনের প্রত্যেকটি বিষয় নেতিবাচক ছিলো না। তিনি অনেক কল্যাণকর কাজও করেছেন। তিনি যাচকগণকে ধন দান করেছেন।সেবকগণের ভরণ-পোষণও করেছে। মিত্রদিগকে বিবিধ প্রকারে ধন প্রদান করেছেন। কিন্তু তাঁর রজোগুণ এবং তমোগুণ প্রবল থাকায় অনেক গুণ থাকার পরেও তিনি সীতা হরণের মত পাপকর্ম করেছেন। এ পাপকর্মের জন্যে দাদা রাবণকে পরিত্যাগ করেছিলেন ছোট ভাই বিভীষণ। বিভীষণ সর্বদা ধর্মে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের থেকেও তাঁর কাছে প্রধান ছিলো ধর্মের অনুসরণ। তিনি ভাই রাবণকে আদর্শিক কারণে ত্যাগ করলেও, বড় ভাই রাবণের চরিত্রের মহত্বকে কখনো ভুলে যাননি। তাই তো রাবণ যখন শ্রীরামচন্দ্রের হাতে মৃত্যুবরণ করলো, তখন বিভীষণের মুখে শোনা যায় রাবণের বিভিন্ন ধার্মিক কর্মকাণ্ডের বর্ণনা। রাক্ষসরাজ রাবণ অগ্নিহোত্রী, অর্থাৎ যাগযজ্ঞাদি কর্মসমূহ করতেন। তিনি ছিলেন মহাতপস্বী, তপস্যা করেই তিনি ব্রহ্মা থেকে বরদান পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বেদ এবং বেদান্তে অত্যন্ত পারঙ্গম।
এষোঽহিতাগ্নিশ্চ মহাতপাশ্চ
বেদান্তগঃ কর্মসু চাগ্র্য়শূরঃ।
এতস্য য প্রেতগতস্য কৃত্যং
তৎ কর্তুমিচ্ছামি তব প্রসাদাৎ ৷৷
(রামায়ণ:যুদ্ধকাণ্ড,১০৯.২৩)
“রাক্ষসরাজ রাবণ অগ্নিহোত্রী, মহাতপস্বী,
বেদান্তবেত্তা এবং যাগযজ্ঞাদি কর্মসমূহে অত্যন্ত পারঙ্গম। এখন আমি আপনার আশীর্বাদ নিয়ে তার লোকান্তরিত প্রেত-কৃত্যাদি সমাধা করতে চাই।”
বিভীষণ লোকান্তরিত বড়ভাই রাবণের শাস্ত্রীয় প্রেত-কৃত্যাদি করার জন্য শ্রীরামচন্দ্রের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। উত্তরে শ্রীরামচন্দ্র এক মহান উক্তি করেন। তিনি বলেন, মানুষ বেঁচে থাকলে বিভিন্ন কারণে একে অন্যের প্রতি যে বৈরিতার উৎপত্তি হয়, মৃত্যুতেই সেই সকল বৈরিতার পরিসমাপ্তি হয়। যুদ্ধ যদি আদর্শিক ধর্ম এবং অধর্মের হয় এবং অধর্মকে আশ্রয় করে কেউ শত্রুপক্ষ হয়ে যায়, তবে সেই অধার্মিক শত্রুর বিনাশের সাথেসাথেই সকল শত্রুতার শেষ হয়ে যায়। শ্রীরামচন্দ্র আরও বলেন, সীতাকে হরণ করায় রাবণকে বধ করা প্রয়োজন ছিলো।
স তস্য বাক্যৈঃ করুণৈর্মহাত্মা
সম্বোধিতঃ সাধু বিভীষণেন।
আজ্ঞাপয়ামাস নরেন্দ্রসূনুঃ ৷
স্বর্গীয়মাধানমদীনসত্ত্বঃ।।
মরণান্তানি বৈরাণি নিবৃত্তং নঃ প্রয়োজনম্।
ক্রিয়তামস্য সংস্কারো মমাপ্যেষ যথা তব৷৷
(রামায়ণ:যুদ্ধকাণ্ড,১০৯.২৪-২৫)
“এইরূপে বিভীষণের করুণাজনক বচনসমূহে রাবণের মাহাত্ম্যাদি ভালোভাবে বুঝতে পেরে উদারচেতা রাজকুমার মহানুভব শ্রীরাম রাবণের উত্তম লোকে গতির জন্য বিভীষণকে অন্ত্যেষ্টি-কর্মাদি সম্পাদন করার অনুমতি প্রদান করলেন।
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বললেন – হে বিভীষণ ! জীবদ্দশাতেই বৈরিতা জন্মায়। শত্রুপক্ষের বিনাশের পর শত্রুতার শেষ হয়ে যায়। আমাদের রাবণবধরূপ প্রয়োজন সফল হয়েছে। অতএব তুমি রাবণের অন্তেষ্টিক্রিয়া সংস্কার সম্পন্ন করো। এখন এ যেমন তোমার প্রিয়পাত্র, তেমনি আমারও।”
শ্রীরামচন্দ্র মহান হৃদয় এবং চরিত্রের বলেই তিনি মর্যাদা পুরুষোত্তম। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষেরা এমন হতে পারি না। আমাদের জীবনে দেখা যায় শত্রু শত্রুতাকে আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে নিয়ে বেড়াই। এতে শত্রুতা দিনেদিনেই মহীরুহ হয়ে উঠে বংশীয় শত্রুতায় রূপান্তরিত হয়ে যায়।শত্রুতার আগুন হলো এমন একটি বিধ্বংসী আগুন, যে আগুন দিনেদিনে বাড়তেই থাকে। তবে আগুন দিয়ে যেমন আগুন নেভানো যায় না। আগুন নেভাতে জলের প্রয়োজন। ঠিক তেমনি শত্রু যদি অধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, তবে শত্রুকে বিনাশের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করে বিনাশ করে ধরাশায়ী করে ফেলতে হবে। যতক্ষণ না বিনাশ নয়, ততক্ষণই শত্রুর প্রতি বিদ্বেষ। কিন্তু শত্রুকে সমূলে বিনাশের পরে, পরবর্তীতে আর কোন শত্রুতার ভাব মনে পোষণ করা সম্পূর্ণভাবে অনুচিত।
লিখেছেন –
ড. শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।