
পরমেশ্বর অচিন্ত্য। তিনি অন্তর্যামী এবং ভূত,বর্তমান এবং ভবিষ্যত এ ত্রিকালের একমাত্র জ্ঞাতা ত্রিকালদর্শী। তিনি জীবের অন্তরলোক সহ এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্রই বিরাজ করেন। সাকার নিরাকার উভয় মতেই তাঁকে উপাসনা করা যায়। সাকার মতে উপাসনায় তাঁকে পঞ্চতত্ত্বে কল্পনা করা হয়। সে পঞ্চতত্ত্ব হলো: শাক্ত মতে ভগবতী আদ্যাশক্তি ; শৈব মতে ভগবান শিব বা শিবের বিভিন্ন রূপ; বৈষ্ণব মতে ভগবান বিষ্ণু অথবা তাঁর মৎস্য-কুর্মাদি বিবিধ প্রকারের অবতার; সৌর মতে ভগবান সূর্য এবং গাণপত্য মতে ভগবান গণেশ বা তাঁর অষ্টবিনায়ক মূর্তি। সনাতন ধর্মে জীবের প্রধান লক্ষ্যই অচিন্ত্য বাক্য এবং মনের অতীত ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হওয়া। তবে সাকার মতে বা উপাসনায় শাক্ত, শৈব বা বৈষ্ণব এ প্রত্যেক মতেই একটি লোক কল্পনা করা হয়েছে। যেমন শৈবদের শিবলোক, বৈষ্ণবদের বিষ্ণুলোক বা গোলোক ইত্যাদি।
একইভাবে শাক্ত সম্প্রদায়েরও যে লোক কল্পনা করা হয়েছে, সে লোকের নাম দেবীলোক বা শক্তিলোক। বেদের ছান্দোগ্য উপনিষদে আমরা আদ্যাশক্তি মহামায়ার পরমধাম দেবীলোক বা শক্তিলোকের সুস্পষ্ট না হলেও প্রচ্ছন্ন বর্ণনা পাই। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, পরমেশ্বরের সৃষ্টির স্বরূপ ব্রহ্মার পুরীর নাম অপরাজিতা। সেখানে ব্রহ্মার দ্বারা বিশেষরূপে সৃষ্ট হিরণ্ময় মণ্ডপ আছে। ব্রহ্মার নিবাসের নাম অপরাজিতা। অর্থাৎ শাক্ততত্ত্ব অনুসারে বলা যায়, ব্রহ্মার শক্তি, ব্রহ্মাণী বা সরস্বতীই হলেন অপরাজিতা। আবার অপরাজিতা শব্দটি বা রূপটি আদ্যাশক্তি মহামায়ার দুর্গারূপের সাথে বারবার শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে।
অথ যদনাশকায়নমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তদেষ হ্যাত্মা ন নশ্যতি যং ব্রহ্মচর্যেণানুবিন্দতেঽথ যদরণ্যায়নমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তৎ তদরশ্চ হ বৈ ণ্যশ্চার্ণবৌ ব্রহ্মলোকে তৃতীয়স্যামিতো দিবি তদৈরম্মদীয়ং সরস্তদশ্বত্থঃ সোমসবনস্তদপরাজিতা পূর্বহ্মণঃ প্রভুবিমিতং হিরণ্ময়ম্ ॥
(ছান্দোগ্য উপনিষদ: ৮.৫.৩)
“আবার লোকে যাকে অনাশকায়ন বলে, তাও ব্রহ্মচর্য; কারণ ব্রহ্মচর্যের দ্বারা যে আত্মাকে লাভ করা হয় সেই আত্মার নাশ হয় না। আবার যাকে অরণ্যায়ন বলে, তাও ব্রহ্মচর্য। সেই ব্রহ্মলোকে— অর্থাৎ এই পৃথিবী লোক থেকে গণনা করে তৃতীয় দ্যুলোক নামক লোকে অর ও ণ্য নামক সমুদ্রদ্বয় আছে। সেখানে ঐরম্মদীয় সরোবর আছে; সেখানে অমৃতস্রাবী অশ্বত্থ আছে; সেখানে ব্রহ্মার অপরাজিতানাম্নী পুরী আছে; সেখানে ব্রহ্মার দ্বারা বিশেষরূপে সৃষ্ট হিরণ্ময় মণ্ডপ আছে।”
বরাহপুরাণসহ বিবিধ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, আদ্যাশক্তি মহামায়া সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ ত্রিগুণ সম্ভূতা হয়ে সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক ত্রিমূর্তিতে প্রকাশিত হলেও আদতে তিনি এক এবং অদ্বিতীয়া। তিনি শ্বেতবর্ণ ব্রাহ্মী বা সরস্বতী মূর্ত্তিতে প্রজা সৃষ্টিসহ সকল সৃষ্টিকর্ম সম্পাদনা করেন। তিনি রজোগুণ সম্ভূতা রক্তবর্ণা হয়েশঙ্খ চক্রগদাপদ্মধারিণী বৈষ্ণবী বা লক্ষ্মী মূৰ্ত্তিতে জগৎসংসার পালন করেন। সেই তিনিই আবার তমোগুণ সম্ভূতা হয়ে কৃষ্ণবর্ণা কালীরূপে হাতে ত্রিশূলধারণ করে সমস্ত জগৎ-সংসারকে সংহার করেন। তমোগুণ সম্ভূতা সে সংহার বা বিনাশের রূপ বিকটদশনা ও ভয়ঙ্করী রৌদ্রামূৰ্ত্তি।
সিতাৎ রক্তাৎ তথা কৃষ্ণাং ত্রিমূৰ্ত্তিত্বং জগাম সা।
যা সা ব্রাহ্মী শুভা মূর্ত্তিস্তয়া সৃজতি বৈ প্রজাঃ।।
সৌম্যরূপেণ সুশ্রোণী ব্ৰহ্মসৃষ্টিবিধানতঃ ॥
যা সা রক্তেন বর্ণেন সুরূপা তনুমধ্যমা।
শঙ্খচক্রধরা দেবী বৈষ্ণবী সা কলা স্মৃতা।
সা পাতি সকলং বিশ্বৎ বিষ্ণুমায়েতি কীর্ত্যতে।।
যা সা কৃষ্ণেন বর্ণেন রৌদ্রা মূর্তিস্ত্রিশূলিনী।
দংষ্ট্রাকরালিনী দেবী সা সংহরতি বৈ জগৎ ॥
(বরাহপুরাণ: ৯০.২৬-২৯)
” তিনি (আদ্যাশক্তি) ত্রিমূর্তি ধারণ করলেন। তাঁর এক মূর্ত্তি শ্বেতবর্ণের, এক মূর্ত্তি রক্তবর্ণের এবং এক মূর্ত্তি কৃষ্ণবর্ণের। তাঁর সেই শ্বেতবর্ণ ব্রাহ্মী মূর্ত্তিতে তিনি প্রজা সৃষ্টিসহ সকল সৃষ্টিকর্মে ব্যাপৃতা হলেন। তাঁর রক্তবর্ণা কৃশোদরী শঙ্খ চক্রগদাধারিণী বৈষ্ণবী মূৰ্ত্তিতে তিনি জগৎসংসার পালন করতে থাকেন। আদ্যাশক্তির রক্তবর্ণা বৈষ্ণবী মূর্তির অপর নাম বিষ্ণুমায়া। তাঁর যে মূৰ্ত্তি কৃষ্ণবর্ণা, ত্রিশূলধারিণী বিকটদশনা ও ভয়ঙ্করী, সেই মূর্ত্তিই রৌদ্রামূৰ্ত্তি। সে রৌদ্রা মূৰ্ত্তিতেই তিনি সমস্ত জগৎ-সংসারকে সংহার করেন।”
আদ্যাশক্তি মহামায়ার লোককে দেবীলোক বা শক্তিলোক যেমন বলে, তেমনি কালিকালোক বা কালিকাপুরীও বলা যায়। সে অচিন্ত্য কালিকাপুরী হলো পরমব্রহ্মময়ী ত্রিগুণাতীত দেবী কালীর পরমধাম। শ্রীমহাভাগবত নামক শাক্ত উপপুরাণে দিব্য সে ধামের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে :
মহাদেব উবাচ।
দুর্গায়া পরমং স্থানং যন্ময়া তে সমীরিতম্।
দুর্গম্যং দেবগন্ধর্বযক্ষকিন্নররক্ষসাম্।।
তৎপার্শ্বেঽতিসুদুর্গম্যং ব্রহ্মাদৌস্ত্রিদশেশ্বরৌঃ।
সুগুপ্তং পরমং রম্যং স্থানমস্তি সুশোভনম্।।
বেষ্টিতং পরিতঞ্চারু সুধাময়মহাব্ধিনা।
অনর্ঘরত্নসম্ভারঘটিতং জ্বলনপ্রভম্।।
তন্মধ্যেঽস্তি পুরং রম্যং রত্নপ্রাকারতোরণম্।
চতুর্দ্বারং চতুর্দিক্ষু মুক্তাজালবিশোভিতম।।
চিত্রধ্বজপতাকাভিরতীব সমলঙ্কৃতম্।
বিচিত্রখট্বাঙ্গকরা রক্তনেত্রা সহস্রশঃ।।
রক্ষন্তি ভৈরবাঃ সর্বে তানী দ্বারানি সর্বদা।।
তস্যা আজ্ঞাং বিনা যানি সমুল্লঙ্ঘ্য সুরাসুরাঃ।
ন শক্নুবন্তি বৈ গন্তুং ব্রহ্মাবিষ্ণুমুখা অপিঃ।।
(শ্রীমহাভাগবত: ৫৯.৪-১১)
“মহাদেব বললেন, আমি আপনাকে ভগবতী দুর্গার যে পরমদিব্যলোকের বর্ণনা দিয়েছি, তা দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ,কিন্নর তথা রাক্ষসদিগেরও অত্যন্ত দুর্গমস্থান।
সেই দিব্যলোকের নিকটে পরম রম্য সুগুপ্ত এবং অতি সুন্দর তথা ব্রহ্মাদি দেবেশ্বরেরও জন্যও দুর্গম স্থান রয়েছে।
সেই স্থানের চারদিকে অমৃতময় মহাসাগরে ঘেরা, বহুমূল্য রত্নদ্বারা সম্পন্ন তথা অগ্নির সমান প্রভা।ওর মধ্যেই রত্ননির্মিত দেওয়ালসহ চারদিকে চারটে দ্বারযুক্ত মতিনির্মিত অত্যন্ত সুশোভিত।
বিচিত্র ধ্বজা পতাকায় অলঙ্কিত একটি সুরম্য পুরী রয়েছে। সে পুরীতে হাতে বিচিত্র খড়্গবাঙ্গ নিয়ে লাল নেত্রধারী হাজার ভৈরব ওই দ্বারগুলো সদা রক্ষা করছেন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রমুখ দেবগণও ভগবতী দুর্গার আজ্ঞা ব্যতীত ঐ সকল দ্বার অতিক্রম করতে পারে না।”
দেবীর আলয় ব্রহ্মাদি দেবগণেরও দুর্গম স্থান। আদ্যাশক্তি ভগবতী দুর্গার আজ্ঞা ব্যতীত সে আলয়ের দ্বার কেউ অতিক্রম করতে পারে না।বিচিত্র ধ্বজা পতাকায় অলঙ্কিত সেই সুরম্য পুরীর দ্বারগুলো বিচিত্র খড়্গবাঙ্গ নিয়ে লাল নেত্রধারী হাজার ভৈরব সদা রক্ষা করছে। সে পুরীর মধ্যে বহুবিধ রত্ননির্মিত মণিদ্বারা সুশোভিত রমনীয় মন্দির রয়েছে। সে মন্দিরের অভ্যন্তরে দশহাজার সিংহযুক্ত সুশোভিত এক সুবিশাল রত্নসিংহাসন রয়েছে। সেই রত্নসিংহাসনের উপরে শবাসন রয়েছে। সে শবাসনের উপরে মহাবিদ্যা মহাকালী সদা বিরাজমান। তিনি সমস্ত প্রাণীর হৃদয়ে থাকেন এবং সেই ব্রহ্মরূপা ভগবতী কালী আপন ইচ্ছায় কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি স্থিতি ও লয় করেন। জয়া, বিজয়াদি চৌষট্টি যোগিনী সদা তাঁর সহচারিণী হয়ে বিবিধ প্রকারের কর্ম সম্পাদিত করেন। সেই ভগবতী দেবীর ডানভাগে মহাকাল সদাশিব বিরাজমান রয়েছে। যাঁর সাথে হৃষ্টচিত্তে মহাকালী সৃষ্টির প্রয়োজনে সদা সংযুক্ত থাকেন। এতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি প্রক্রিয়া চলমান।অতিআশ্চর্যময় এবং সৌন্দর্যময় আদ্যাশক্তি মহাকালীর অন্তঃপুর। বাইরে থেকে অসংখ্য ভৈরব দ্বারা সেই সুরক্ষিত। দেবরাজ ইন্দ্র দেবীর অন্তঃপুরে এসে, তাঁর দর্শনে ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। পেয়েছিলেন। দেবীর আলয়ে শিব এবং শক্তি একাত্মা হয়ে বিরাজমান। তাই সদাশিবের কৃপাতেই দেবীর দর্শন লাভ হয়।
তন্মধ্যে মন্দিরং রম্যং নানারত্নবির্নির্মিতম্।
মণিস্তম্ভশতৌযুক্তং সুবর্ণেনাভিবেষ্টিতম্।
তন্মধ্যেঽযুতসিংহাঢং রত্নসিংহাসনং মহৎ।।
তস্যোপরি পরিন্যস্তশবৌপরি মহেশ্বরী।
মহাবিদ্যা মহাকালী সদা তিষ্টতি নারদ।।
ব্রহ্মাণ্ডকোটিকোটিনাং সৃষ্টিস্থিতিবিনাশিনী।
একৈব হি মহাদেবী স্বেচ্ছয়া ব্রহ্মরূপিনী।।
বিজয়াদিচতুঃষষ্টিযোগিন্যং পরিচারিকাঃ।
পুরকর্মাণি কুর্বন্তি সদা সাবহিতা মুনেঃ।।
তস্যাস্তু দক্ষিণেঃ ভাগেঃ মহাকালঃ সদাশিবঃ।
তেন সার্দ্ধং মহাকালী কৃষ্ণা সংরমতে সদা।।
এবমন্তপুরং তস্যা ভৈরবৈরভিরক্ষিতম্।
অত্যাশ্চর্য্যতমং সৌমং ব্রহ্মাদীনাং সুদুর্লভম্।।
ব্রহ্মেশবিষ্ণুভি সার্দ্ধং সমাগত্য মহামতে।
তস্যা দর্শনমাত্রেণ সুরাধীশঃ পুরন্দরঃ।।
মুক্তৌঽভবদব্রহ্মহত্যাজনিতাদ্ ঘোরকিল্বিষাৎ।
তদৈব বদৃশুস্তত্রো ব্রহ্মাবিষ্ণুপুরন্দরাঃ।।
প্রসাদাদ্দেবদৈবস্য কালীং পরমদেবতাম্।
তদ্বহির্বর্ণয়ে বৎস শৃণু সাবহিতো মুনে।।
সর্বত বেষ্টিতং রত্নপ্রাকারৈর্বহিরন্তরম্।
চতুর্দিক্ষু চতুর্দ্বারং রত্নতোরণভূষিতম্।।
তানি রক্ষন্ত্যবিরতং সর্বে তু গণনায়কাঃ।
তদন্তশ্চাপি যোগিন্যঃ কামাখ্যাদ্যা মহামতেঃ।।
(শ্রীমহাভাগবত: ৫৯.১২-২২)
” সে পুরীর মধ্যে বহুবিধ রত্ননির্মিত মণিদ্বারা সুশোভিত রম্য মন্দির রয়েছে। ওই মন্দিরের মধ্যে দশহাজার সিংহযুক্ত সুশোভিত এক সুবিশাল রত্নসিংহাসন রয়েছে।
হে নারদ, সুবিশাল রত্নসিংহাসনের উপরে শবাসন রয়েছে। সে শবাসনের উপরে মহাবিদ্যা মহাকালী সদা বিরাজমান। তিনি সমস্ত প্রাণীর হৃদয়ে থাকেন এবং সেই ব্রহ্মরূপা ভগবতী কালী আপন ইচ্ছায় কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি স্থিতি ও লয় করেন।
হে মুনি, বিজয়াদি চৌষট্টি যোগিনী সদা তাঁর পরিচারিকা বা সহচারিনী হয়ে পুরকর্ম সম্পাদিত করেন। সেই ভগবতী দেবীর ডানভাগে মহাকাল সদাশিব বিরাজমান রয়েছে। যাঁর সাথে হৃষ্টচিত্তে মহাকালী সৃষ্টির প্রয়োজনে সদা সংযুক্ত থাকেন।অতিআশ্চর্যময় এবং সৌন্দর্যময় আদ্যাশক্তি মহাকালীর অন্তঃপুর বাইরে থেকে ভৈরব দ্বারা সুরক্ষিত এবং ব্রহ্মাদি দেবতাগণের কাছেও সে অন্তঃপুর সুদুর্লভ।
হে মহামতে, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরকে সাথে নিয়ে দেবরাজ ইন্দ্র দেবীর অন্তঃপুরে এসে ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। ওইসময় ব্রহ্মা বিষ্ণু তথা দেবরাজ ইন্দ্র দেবাদিদেব সদাশিবের কৃপাতেই সে দর্শন প্রাপ্ত হয়েছিলেন।বৎস নারদ মুনি, এবার আমি ওখানকার বাইরের দৃশ্য বর্ণনা করছি। সাবধানে শ্রবণ কর।
সে রত্ন নির্মিত পুরীর চার দিক থেকে ঘেরা একটি মনোরম স্থান রয়েছে, যার চারিদিকে রত্নের তোড়ণে সুশোভিত চারদিকে চারটি দ্বার রয়েছে।
সকল গণনায়ক সে দ্বার সর্বদা রক্ষা করে চলেছেন এবং কামাখ্যাদি যোগিনীগণ সে পুরীমধ্যে অবস্থিতা।”
তদ্রহিদর্শনাকাঙ্ক্ষি-ব্রহ্মাণঃ কতি কোটয়ঃ।
স্থিতা ধ্যানসমাসক্তা নানাব্রহ্মাণ্ডবাসিনঃ।।
তদ্বহিস্ত চতুর্দ্বারং তদ্বৎ প্রাকারবেষ্টিতম্।
রক্ষন্তি কোটিস্তানি দ্বারাণি ভৈরবা সদা।।
তদ্বহিঃ কোটিশঃ সন্তি হীন্দ্রাদ্যাস্ত্রিদশেশ্বরাঃ।
ধ্যাননিষ্ঠাশ্চিরেনাপি সকৃদ্দর্শনকাঙ্ক্ষিণ।।
এবং বহুবিধং দ্বারং নানারত্নপরিষ্কৃতম।
রক্ষন্তি কোটিশঃ সর্বে দেব্যাজ্ঞাপরিপালকাঃ।।
পারিজাতং বনং রম্যমুত্তরে পরিকীর্তিতম্।
প্রফুল্লং কুসুমাকীর্ণ চিত্রভ্রমরসংকুলম।।
বসন্তঃ সর্বদা তত্র বায়ুর্বাতী শনৈঃ শনৈঃ।
বিচিত্রপক্ষিরূপেন ব্রহ্মাবিষ্ণুমুখা সুরাঃ।।
গায়ন্তি চরিতং কাল্যাস্তোস্মিন্মধুরতিঃস্বনৌ।
পূর্বস্যাং মুণিশার্দূল রম্যং চারুতরং সরঃ।।
স্বর্ণপঙ্কজকহ্লাকুমুদৈরতিশোভিতম্।
বিচিত্রমধূপশ্রেণ্য ঈয়ূর্বায়ুপ্রকম্পিতৈঃ।।
নানাবিধৈঃ সুপষ্পৈশ্চ কূলং তস্য মনোহরম্।
বিচিত্রমণিসন্নন্ধসোপানৈরপি শোভিতম্।।
এবং তস্যা পুরং রম্যং বাচাতীতং মহামতি।
তথান্যাসাঞ্চ বিদ্যানাং নবানামপি তত্র বৈ।।
এবং প্রত্যেকতো রম্যং পুরমস্তি পৃথক্ পৃথক্।।
তাসাঞ্চ দক্ষিণে ভাগেঃ নানারূপঃ সদাশিবঃ।
আস্তে পৃথক্ পৃথক্ তেন রমতে সা পৃথক্ পৃথক্।।
(শ্রীমহাভাগবত: ৫৯.২৩-৩৩)
“অন্তঃপুরের বাইরে কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের কোটি কোটি ব্রহ্মা পরমেশ্বরী ভগবতী আদ্যাশক্তি মহামায়ার দর্শনের অভিলাষ নিয়ে ধ্যানস্থ হয়ে আছেন।
এর বাইরে বহুবিধ রত্ননির্মিত আরও চারটি দ্বার সংযুক্ত একটি পুরী আছে।কোটি কোটি ভৈরব সে দ্বারের রক্ষক।
পরমেশ্বরী ভগবতীর একবার দর্শনের ইচ্ছায় ইন্দ্রাদি সকল দেবগণ ধ্যানস্থ হয়ে অনন্তকালধরে উপবিষ্ট আছেন।
ভগবতীর আজ্ঞায় কোটি কোটি ভৈরব গণ সেই দ্বার রক্ষা করতে তৎপর।সেই পুরীর উত্তরদিকে বিচিত্র ভ্রমরযুক্ত এবং পুষ্পদ্বারা সুশোভিত এক মনোরম পারিজাত বন রয়েছে। সে বনে সদা বসন্ত নিত্য বিরাজিত থাকে এবং তথায় মৃদু মৃদু বাতাস বয়ে চলে। ওখানে ব্রহ্মা বিষ্ণু প্রমুখ দেবতা বিচিত্র পক্ষিরূপে সেই ভগবতী মহাকালীর মাহাত্ম্যগাথা মধুরস্বরে গুণগান করেন।
মুণিশ্রেষ্ঠ ওই পুরীর পূর্বভাগে অত্যন্ত মনোরম এক সরোবর আছে। ওই সরোবর স্বর্ণময় পদ্মফুল দ্বারা সুশোভিত। বিচিত্র মধুপকুল সেই সরোবরে সর্বদা বিচরণ করেছে। সরোবরের তীরের মনোহর পুষ্পদল বায়ুপ্রবাহে চঞ্চল। বিবিধ বর্ণের উজ্জ্বল মণিদ্বারা নির্মিত সে সরোবরের সিঁড়ি।
হে মহামুনি, এই প্রকারে ভগবতীর সেই রম্য পুরী বর্ণনারও অতীত। এই প্রকারে অন্য নয়জন মহাবিদ্যা প্রত্যেকেরই এমন রত্ননির্মিত স্বতন্ত্র রম্যপুরীও তথায় বিদ্যমান। সেই সকল বিদ্যার প্রত্যেকেরই দক্ষিণভাগে পৃথক পৃথক সদাশিব নানা মূর্তিতে নানা রূপে বিরাজমান। সদাশিব পৃথক পৃথক রূপে সকল মহাবিদ্যার সাথেই বিরাজ করেন।”
মহাভাগবত পুরাণে আদ্যাশক্তি দেবীর আলয়ের বর্ণনায় আছে যে, তাঁর অন্তঃপুরের বাইরে কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের কোটি কোটি ব্রহ্মা পরমেশ্বরী ভগবতী আদ্যাশক্তি মহামায়ার দর্শনের অভিলাষ নিয়ে একাগ্র হৃদয়ে ধ্যানস্থ হয়ে আছেন। আদ্যাশক্তি মহামায়া কালীর এ ভাবটি আমরা কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতেও সুস্পষ্টভাবে রয়েছে। কবি নজরুল ইসলাম যে শাক্তপুরাণগুলো খুব ভালো করেই আত্মস্থ করেছিলেন, তা তাঁর সংগীতে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।
“মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি পরমেশ্বরী কালিকা।
পরমা প্রকৃতি জগদম্বিকা, ভবানী ত্রিলোক-পালিকা।।
মহাকালি মহাসরস্বতী,
মহালক্ষ্মী তুমি ভগবতী
তুমি বেদমাতা, তুমি গায়ত্রী, ষোড়শী কুমারী বালিকা।।
কোটি ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র মা মহামায়া তব মায়ায়,
সৃষ্টি করিয়া করিতেছ লয় সমুদ্রে জলবিম্ব-প্রায়।
অচিন্ত্য পরমাত্মারূপিণী,
সুর-নর চরাচর-প্রসবিনী।
নমস্তে শিরে অশুভ নাশিনী, তারা মঙ্গল চন্ডিকা।
নমস্তে শিরে অশুভ নাশিনী, তারা মঙ্গল সাধিকা।।”
আদ্যাশক্তি মহামায়ার এ দেবীলোক যে সাধকের অভ্যন্তরে সহস্রারপদ্মে বিরাজিত এ বিষয়টি আমরা সুস্পষ্টভাবে মুণ্ডমালাতন্ত্রেই পাই। সেখানে বলা হয়েছে,
পৃথিবীতে চিন্তামণির প্রসাদে সকল সিদ্ধি লাভ হয়। সে সিদ্ধির সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্ধি হলো মুক্তি। যে মুক্তিতে সাধকের ইষ্টদেবতার দর্শন হয়। মুণ্ডমালাতন্ত্রে বলা হয়েছে, ব্রহ্মাদি দেববৃন্দের দ্বারা পরিসেবিত সেই কালীপুর বা দেবীলোকের অবস্থান হলো সাধকের সহস্রারপদ্মে। সেখানে আদ্যাশক্তি মহামায়া দেবীর সাথে সাথে ত্রিলোকেশ সদাশিবও বিরাজমান।
শৃণু দেবেশি ঘোরাভে করালাস্যে দিগম্বরে ।
চিন্তামণি-প্রসাদেন কিং ন সিধ্যতি ভূতলে ॥
মুলে চতুৰ্দ্দলে পদ্মে স্বাধিষ্ঠানে চ ষটদলে ।
মণিপুরেঽনাহতে চ বিশুদ্ধাজ্ঞাখ্যকে প্রিয়ে ॥
এবং চক্রং পরিন্যস্তং দশ-দ্বাদশ-ষোড়শৈঃ।
দলৈস্তু শঙ্করং বর্ণং ন্যস্তং পরমতত্ত্বতঃ ॥
যজেৎ কালীপুরং দেবি ব্রহ্মাদ্যৈঃ পরিসেবিতম্।
নীলকণ্ঠং ত্রিলোকেশং সহস্ৰাব্জ-নিবাসিনম্ ॥
কোটীশং কুলকোটীশং সাধকেন্দ্রৈঃ সুশোভিতম্।
ধ্যায়েৎ পরম-নির্বিণ্ণো দেবঃ পরম-পাবনঃ ॥
(মুণ্ডমালাতন্ত্র: ষষ্ঠ পটল, ৩১-৩৫)
” হে দেবেশি, হে ঘোরাভে, হে করালমুখে, হে দিগম্বরে, তুমি শুন- এই পৃথিবীতে চিন্তামণির প্রসাদে কিই না সিদ্ধি হয় অর্থাৎ সকল কিছুই সিদ্ধ হয় ।
হে প্রিয়ে, মূলাধারে চতুর্দল পদ্মে, স্বাধিষ্ঠানে ষড়দল পদ্মে, মণিপুরে দশদল পদ্মে, অনাহতে, বিশুদ্ধে ও আজ্ঞাচক্রে পরমতত্ত্ব শঙ্করের পূজা করবে । ঊর্ধ্বাধঃ ক্রমে এই চক্রগুলি বিন্যস্ত এবং দশ, দ্বাদশ ও ষোড়শ দলের দ্বার যুক্ত ও বর্ণসমূহের দ্বারা ব্যাপ্ত ৷
হে দেবি ব্রহ্মাদি দেববৃন্দের দ্বারা পরিসেবিত কালীপুরের পূজা করবে সহস্রার পদ্ম-নিবাসী ত্রিলোকেশ নীলকণ্ঠকে পূজা করবে।
পরম নির্বেদযুক্ত হইয়া সাধকেন্দ্রগণের দ্বারা সুশোভিত কোটীশ ও কোটিশকে ধ্যান করবে। সেই দেব পরম পবিত্রকারক।”
লিখেছেন –
ড. শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।